ঢাকার কাকরাইল বস্তিতে বাস করে আনিসা। কিছুদিন ধরে তার চোখের সাদা অংশ বাদামি রং ধারণ করেছে। অল্প আলোতে সে চোখে ঝাপসা দেখছে। আনিসা অনেক দিন ধরে মুখে ঘা ও ঠোঁট ফাঁটা সমস্যায়ও ভুগছে। এছাড়া তার মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে লাগছে। সবকিছু মিলে সে এতটাই দুর্বল যে কোনো কাজ করা তো দূরে থাক, উঠে দাঁড়াতেও তার কষ্ট হচ্ছে।
সামাজিক সমস্যা সমাজের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে বিধায় একে সর্বজনীনভাবে ক্ষতিকর বিবেচনা করা হয়। বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত কোনো সমস্যাকে সামাজিক সমস্যা বলা যায় না। যখন কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত সমস্যা সমাজের অধিকাংশ মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তখন বা সামাজিক সমস্যারূপে গণ্য হয়। এটি সমাজের সামগ্রিক মঙ্গলের পরিপন্থী। এছাড়া সামাজিক সমস্যা সব দেশের সব সময়ের সমাজের মানুষের জন্যই ক্ষতিকর। কোনো সমাজের মানুষই সামাজিক সমস্যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি। তাই সামাজিক সমস্যাকে সর্বজনীন ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যে খাদ্যে খাবারের ছয়টি গুণ, যেমন- আমিষ, শর্করা, স্নেহ পদার্থ, পানি, খনিজ লবণ ও ভিটামিন বিদ্যমান সেই খাবার হলো পুষ্টিসম্মত খাবার। এ ধরনের খাবারের অভাবে শরীরে যে অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাই হলো অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতা। আনিসার ক্ষেত্রে এ অস্বাভাবিক অবস্থাই দৃষ্টিগোচর হয়। বস্তিবাসী আনিসা চোখে সমস্যা, মুখে ঘা, ঠোঁট ফাঁটা সমস্যাগুলোতে ভুগছে। এছাড়া রক্তস্বল্পতার জন্য তার মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এসব সমস্যার কারণে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা মূলত অপুষ্টির কারণেই হয়। মানবদেহের স্বাভাবিক অবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের গুণগত ও পরিমাণগত অভাবজনিত অবস্থাকে অপুষ্টি বলা হয়। দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও গুণগত খাবার। এ ধরনের খাবারের ঘাটতিই অপুষ্টির সৃষ্টি করে। এ অবস্থা শরীরে নানা ধরনের রোগের জন্ম দেয়, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত করে, কর্মশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে। এছাড়া পুষ্টিহীনতার কারণে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। যার ফলে স্বাভাবিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়। উদ্দীপকের আনিসার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটার কারণে বলা যায়, সে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।
উক্ত সমস্যা অর্থাৎ পুষ্টিহীনতা সৃষ্টি হওয়ার জন্য মৌলিক মানবিক চাহিদার অপূরণকে দায়ী করা যায়।
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো পূরণ করা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশে দারিদ্র্য, অধিক জনসংখ্যা প্রভৃতি কারণে অনেকেই মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যাগুলোর মধ্যে পুষ্টিহীনতা অন্যতম। আমাদের দেশের অনেক মানুষ ঠিকমতো খাবার পায় না। আর পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান দরিদ্র লোকের জন্য প্রায় অসম্ভব। এছাড়া খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কেও এদেশের বেশিরভাগ মানুষ অজ্ঞ। ফলে পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তারা স্বাস্থ্যহীনতায় বা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এ কারণে এদেশের মানুষ রক্তশূন্যতা, চক্ষুরোগ, রাতকানা, রিকেটসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
আবার সুস্বাস্থ্যের জন্য শুধু খাবারই পর্যাপ্ত নয়, ভালো আবাসন, পোশাক এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এদেশের মানুষ পর্যাপ্ত বাসস্থান, পোশাক এবং চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। শহর এলাকায় বস্তি সমস্যা, গ্রাম এলাকায় চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতার কারণে অনেকেই অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় দিন পার করছে। এসব কারণে পুষ্টিহীনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ আলোচনা থেকে তাই বলা যায় অপুষ্টি নামক সমস্যাটি সৃষ্টি হওয়ার জন্য মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ না হওয়াই বেশি দায়ী।
সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালন বিবাহের অন্যতম কাজ। বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয়। আর পরিবার সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালনের সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। মানব শিশুর লালন-পালনের দায়িত্ব বাবা-মার ওপরই বর্তায়। বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করায় শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ ও লালন-পালনে কোনো সমস্যা হয় না।
উদ্দীপকে মকবুলের পরিবারের সদস্যরা খাদ্য চাহিদা থেকে বঞ্চিত।
মানবজীবনের প্রথম ও প্রয়োজনীয় চাহিদা হলো খাদ্য। শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। মানুষের দেহের জন্য প্রয়োজন খাদ্য। এটা যদি সে না পায় তাহলে সে বাঁচতে পারে না। তাই খাদ্য বলতে আমরা ঐ বস্তু বা দ্রব্যকে বুঝে থাকি যা শরীরে হজম হয় এবং শরীরের বৃদ্ধি ও কর্মশক্তি দানে সাহায্য করে থাকে। আর এ খাদ্য হতে হবে ছয়টি উপাদান মিশ্রিত, যেমন- আমিষ, শর্করা, চর্বি, লবণ, ভিটামিন ও পানি। যা বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণের মাধমে শরীর পেয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান ও বুদ্ধি লোপ পায়। উদ্দীপকের মকবুল মিয়ার আট সন্তান। সামান্য কৃষিকাজ করে তিনি সন্তানদের প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। ফলে তারা বেশিরভাগ সময়ই বিভিন্ন ধরনের অসুখে ভোগে। তাই বলা যায়, খাদ্যের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় মকবুলের পরিবার বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছে।